করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী যারা

৬৫

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। প্রতিদিনই বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা। সুস্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেকে, আবার দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিলও। করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এমন কজন জানিয়েছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা।
বুঝেছি, বেঁচে থাকাই আনন্দের
আফরিনা পারভীন, বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র

মার্চ মাসের শেষের দিককার কথা। দু-তিন দিন ধরে শরীরে ব্যথা অনুভব করছিলাম। খাবারেও অরুচি মনে হচ্ছিল। এরই মধ্যে এক রাতে আমার ছেলে করোনার উপসর্গ বুঝতে পেরে চিৎকার করে বসল। আমরা শহরে করোনার প্রাদুর্ভাব ছড়ানোর পর থেকে সাবধানে থাকছি। ছেলেটা নিজেও বাইরে যায় না। ভাবছিলাম, তবু কি আক্রান্ত হতে পারে! সে রাতেই আমারও কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল, সঙ্গে তীব্র ব্যথা।

সকাল হতেই ছেলেকে করোনা পরীক্ষা করাতে যেতে বললাম। কিছুটা সুস্থতা বোধ করায় আমি কাজে চলে গেলাম। বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতালে কাজ করি আমি। অফিসে দুপুরে ওষুধ খাওয়ার পর জ্বর অনেকটা কমে গেল। তবে রাতে আবারও জ্বর এল, শুরু হলো ব্যথাও। দিনে ভালো, রাতে অসুস্থতা—দুদিন এভাবেই কাটল।

২ এপ্রিল ছেলের রিপোর্ট দেওয়ার কথা। ১২টায় পেলাম ছেলের খুদে বার্তা, ‘আই হ্যাভ টেস্টেড পজিটিভ’। বুঝতে অসুবিধা হলো না, ছেলে করোনায় আক্রান্ত, তার মানে আমরাও। সুপারভাইজারের অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার স্বামীকে অফিস থেকে নিয়ে সোজা হাসপাতালে গেলাম। আমার জ্বর ছিল, তাই আমার টেস্ট করল। আমার স্বামীর জ্বর না থাকায় পরীক্ষা করল না।

নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ নিয়ে বাসায় ফিরলাম। ওষুধ বলতে শুধু টাইরানল আর তরল খাবার খেতে হতো। স্যুপ, জুস—এসব পান করতে হতো। কিন্তু মুখে কোনো স্বাদই পেতাম না।

৪ এপ্রিল বিকেলে হাসপাতাল থেকে জানাল, আমার করোনা রিপোর্ট পজিটিভ। খবর শুনে একটু ভয় পেয়েছিলাম। কাছের মানুষেরা জানেন, আমি মানসিকভাবে অনেক শক্ত, নির্ভয়ে অস্ত্রোপচারকক্ষে চলে যাওয়ার ঘটনাও আছে। তবে সেই রাতে কতটা ভয় পেয়েছিলাম, সেই বর্ণনা আমি কোনোভাবেই করতে পারব না। শুধু মনে হচ্ছিল রাত কেন এত কালো, এত চুপচাপ, এত এত মানুষ পৃথিবীতে, আমার কেন নিঃসঙ্গ লাগছে! অন্য শহরে থাকা আমার মেয়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বারবার। ইচ্ছে করছিল ছেলের ঘরে ছুটে যাই। এদিকে শরীরে লাখ কোটি বিষ মেশানো পিনের খোঁচা, সকাল কেন হয় না! আল্লাহ, আমি আরও অনেক বছর বাঁচতে চাই। নিজের জন্য জীবনে এই প্রথম স্রষ্টার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলাম।

ভোর হলো, জ্বর কিছুটা কম, সঙ্গে ব্যথাও। সারা দিন এভাবেই গেল। ৫ ও ৬ এপ্রিল একই রকম কাটল। ৭ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকেই মনে হচ্ছিল আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কষ্টটাও বাড়তে থাকল। ভাবলাম, মনের ভুল। ঘুমিয়ে গেলাম। রাত তিনটার পর ঘুমের ভেতর মনে হলো, কেউ গলা চিপে ধরছে বারবার। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে আমার স্বামীকে বললাম জরুরি সেবার নম্বর—৯১১–এ কল করতে। অ্যাম্বুলেন্স এলে হাসপাতালে গেলাম। অনেক টেস্ট করল, ইসিজি, বুকের এক্স-রে, রক্তের পরীক্ষা। স্যালাইন দিল। ভোর ছয়টার দিকে ডাক্তার এসে বলল, ‘তোমার ল্যাবরেটরি টেস্ট খুবই ভালো এসেছে, তোমাকে আমরা শিগগিরই রিলিজ দেব।’

হাসপাতালের বাইরে এসে মনে হলো, করোনা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। মনে অনেক সাহস আর জোর নিয়ে বাসায় ফিরলাম। যদিও শরীর সায় দিচ্ছিল না। জোর করে খেতে শুরু করলাম, সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম। আহা জীবন! কী অনিন্দ্যসুন্দর জীবন, বেঁচে থাকা এত আনন্দের!

আবার প্রাণভরে গল্প করব
আর্থ কিশোর, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ

‘কী দেখছ, স্বচ্ছ আলো?/ ভুল দেখেছ, মরণছোবল/ তোমরা বরং ঘরেই থাকো/ তাতেই হবে সবার ভালো।’

করোনা ওয়ার্ডে আমার নির্ধারিত বিছানায় বসে একটা ছবি তুলেছিলাম। মশারি টানানো সারি সারি পাতানো বিছানাগুলো আলো-আঁধারিতে কেমন যেন ভয় জাগিয়েছিল মনে। সেই ছবি ফেসবুকে দিয়ে শুরুর দিনগুলোর কথা লিখেছিলাম। ঘরে থাকাই যে করোনা প্রতিরোধের মোক্ষম দাওয়াই, তা–ই বলেছিলাম।

আমার এখন দিন কাটছে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে। এখানে আমারই মতো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ১৬ কি ১৭ জন আছেন। প্রকৃতির এক অমোঘ সত্যকে মেনে নিয়ে তাঁরা স্রষ্টাকে ডাকছেন। কারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শেষবিদায়ও নিচ্ছেন কেউ কেউ। ১৫ এপ্রিল আমার সামনের বিছানা থেকে দুজনের শ্বাস বন্ধ হলো চিরতরে। তখন ভেতরটা অজানা ভীতিতে কেঁপে উঠল। আমার তো অনেক কিছু করার বাকি আছে। আমি তো এক অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে হেরে যেতে পারি না।

এই মনোবল নিয়েই কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে ঢাকার এই হাসপাতালে এসেছিলাম। শুরু থেকেই কাছের মানুষ অনবরত সাহস জোগাচ্ছে। এই তো কদিন আগেও সব তো স্বাভাবিক ছিল। আমার ওষুধের দোকানেই বসে ছিলাম। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জে যখন আক্রান্ত মানুষ পাওয়া গেল, তখন থেকেই সতর্ক হয়ে দৈনন্দিন কাজ করি। তবু ৯ এপ্রিল হঠাৎ করে যেন অনুভব করলাম, আমার কাশি বেড়েছে। মাসখানেক আগেও এমন কাশি হয়েছিল, তাই তেমন কিছু মনে হলো না। কিন্তু পরদিন থেকে জ্বর। অবহেলা না করে ১২ এপ্রিল করোনার নমুনা পরীক্ষা করাতে দিলাম। ১৩ এপ্রিল রিপোর্ট পেলাম, করোনা নেগেটিভ। আক্রান্ত নই জেনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। কিন্তু সেই স্বস্তি কয়েক ঘণ্টা পর উবে গেল। পরে জানানো হলো, করোনা পজিটিভ।

দুনিয়ার মানুষের কাছে অজানা এক রোগে আক্রান্ত হলাম। ভয় করলেও মনোবল হারালাম না। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম, বাড়িতে যাব না, আমার মাধ্যমে যেন কেউ আক্রান্ত না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতাল থেকেই জানাল, আমি ঢাকায় আসব কি না। পরিবার আর এলাকার মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমি রাজি হলাম। সেদিনই নিজ খরচে বিশেষ বাহনে চলে এলাম কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে।

স্রষ্টা চাইলে শিগগিরই ফিরে আসব প্রিয় মানুষদের কাছে। অনেক কথা, অনেক গল্প জমে যাচ্ছে, ফিরে এসে জমিয়ে আড্ডা হবে বন্ধুরা, প্রাণভরে গল্প হবে ফের। (অনুলিখিত)

আমরা যেন নতুন জীবন পেলাম
নাসিরুল ইসলাম ,গালারাতে, ইতালি

ইতালির বিখ্যাত শহর মিলান থেকে ৪০ কিলোমিটারের দূরত্বে গালারাতে। ছিমছাম, ছোট শহরটিতে বাবা আর আমি থাকি। পরিবারের অন্য সদস্যরা বছরের ভিন্ন সময়ে এলেও এখন সবাই ঢাকায় আছে। করোনাভাইরাস যখন ইতালিজুড়ে ছড়াতে থাকল, তখন থেকেই আমরা সচেতন।

এমন পরিস্থিতিতে গত ৯ মার্চ হঠাৎ করেই আমার বাবা সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার অসুস্থ হলেন। সর্দি-জ্বর শুরু হলো। দিন গড়াতেই জ্বর বাড়তে থাকল। পরিচিত চিকিৎসক উপসর্গ শুনে ব্যবস্থাপত্র পাঠালেন। কিন্তু তাতেও জ্বর কমছিল না। এদিকে ১৩ মার্চ আমিও অসুস্থ বোধ করতে থাকি। আচমকাই শুরু হয় জ্বর, সর্দি, শরীর ব্যথা আর হালকা কাশি।

আমার অসুস্থতা নিয়ে যত না ভাবতাম, ঢের চিন্তা করতাম বাবাকে নিয়ে। বছরখানেক আগেই তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র আর ফুসফুসের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। করোনা সংক্রমণ হলে কী হবে, তা-ই ভাবতাম। সেই ভাবনার মধ্যেই ১৯ মার্চ বাবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। বিশেষ নম্বরে কল করলে করোনা আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকেরা আসেন। পরদিন বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কৃত্রিম অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। নমুনা পরীক্ষা করে জানা যায়, করোনা পজিটিভ।

এদিকে আমারও শারীরিক সমস্যাগুলো প্রকট হতে থাকে। মুখে খাবারের স্বাদ চলে গেছে আগেই, কোনো কিছুর গন্ধ পেতাম না। মাঝখানে এমন হলো, ঘুম আসছে না। রাতগুলো কেটে গেল নির্ঘুম। কিন্তু না ঘুমালে অসুস্থতা আরও বাড়বে, চিকিৎসকেরা বলেন এ কথা। আরও কিছু পরামর্শ দেন তাঁরা। আমার শ্বাসকষ্ট ছিল না বলে সেসব নির্দেশনা মেনে বাসাতেই থাকি।

সেই দিনগুলোতে বাংলাদেশে থাকা পরিবারের মানুষদের সান্নিধ্য অনুভব করেছি। দুশ্চিন্তা করবে ভেবে শুরুতে তাঁদের আক্রান্তের বিষয়টি জানাইনি, কয়েকদিন পর জানাই।

বাসায় আমি একা রান্না করতাম। স্বাদহীন খাবারগুলো জোর করে খেতাম। ওদিকে বাবার খোঁজ নিতাম ফোনে। সপ্তাহখানেক পর তিনি কিছুটা সুস্থ হন। বাসায় যেহেতু আমি আক্রান্ত, তাই অন্য এক হাসপাতালে স্থানান্তর করে তাঁকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। সেখানে নমুনা পরীক্ষা চলে। কয়েক দিনে চার দফা পরীক্ষা করা হয়। সর্বশেষ পরীক্ষায় তাঁর রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। এদিকে আমিও সুস্থ হয়ে উঠি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ১২ এপ্রিল বাবা বাসায় আসেন। এক মাস করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে আমরা যেন নতুন জীবন পাই!

এই বিভাগের আরও খবর